রণতোষ মুখোপাধ্যায়:- খাঁ খাঁ গ্রীষ্মের দুপুর৷ সীমাহীন বিদ্যুৎ বিভ্রাটে থমকে থাকা বৈদ্যুতিক পাখার একমাত্র বিকল্প ছিল হাত পাখা বা তালপাতার পাখা। ঐ ভ্যাপসা গরমেও ছেলেপুলে গুলো দুদন্ড শান্তিতে দুচোখের - পাতা এক করতে পারত কারন--মা ঠাকুমার হাতে সব সময়ে অবিরাম চলত হাতপাখা৷ তবে এখন সেই ছবিটা পাল্টেছে। প্রযুক্তির হাত ধরে বাজারে এখন ইলেকট্রিক পাখা , এসি , এয়ার কুলারের দাপট। আর এদের সঙ্গে অসম প্রতিযোগিতায় ক্রমশই পিছিয়ে পড়ছে বাংলার ঐতিহ্য তালপাতার হাতপাখা৷ বিক্রেতারা বলছেন , প্রতি বছরই বিক্রি কমছে হাতপাখার।
হাত পাখা ছাড়াও আরেক ধরনের পাখা ছিল। এই পাখা কাপড়ের তৈরি। মাথার উপর সিলিংয়ে ঝুলানো থাকত মোটা কাপড়। এর চারদিকে মোড়ানো থাকত লালসালু। এর সঙ্গে যুক্ত থাকত দড়ি। দূরে বসে একজন দড়ি ধরে টানত। দড়ির টানে লালসালু যুক্ত মোটা কাপড় এদিক-ওদিক নড়াচড়া করতো। এতে সারা ঘরময় বাতাস খেলে যেত। এক সময় অফিস-আদালতে মাথার উপর সিলিংয়ে ঝুলানো এ ধরনের পাখা টেনে বাতাস করার রেওয়াজ ছিল। বেশি দিন আগের কথা নয়। এই ইংরেজ আমলে এমন কি ইংরেজ আমলের পরেও এ উপমহাদেশে জজ-ম্যাজিষ্ট্রেটের আদালতে এ ধরনের পাখা টেনে বাতাস করার ব্যবস্থা ছিল। তখন এ কাজের জন্য সরকারি কর্মচারীও নিযুক্ত ছিল।
কিন্ত্ত এখন প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই এসে গিয়েছে বিদ্যুৎ।সিলিং থেকে ঝুলে থাকা বৈদ্যুতিক পাখা থেকে এসি - স্যুইচ অন করলেই নিমেষে ঠান্ডা। তার জন্য কাউকে ঠায় পাখা হাতে বাতাস করতে হয় না৷ হাতপাখা বিক্রেতাদের কথায় , ‘এতদিন তাও লোডশেডিংয়ের সময়ে হাতপাখার খোঁজ পড়ত৷ কিন্ত্ত এখন সে ভাবে আর লোডশেডিং -ও হয় না৷
আর ক্ষণিকের এই বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কষ্ট এড়াতে রয়েছে ইনভার্টার । ব্যাটারি চালিত পাখাও দেদার বিকোচ্ছে বাজারে৷
একটা তালপাতা থেকে একটা বা দুটো পাখা তৈরি করা যায়। শীতের মাঝামাঝি সময়েই তালপাতার পাখা তৈরির কাজ শুরু হয়ে যায়। তালগাছের পাতা কাটা, তাকে জলে ডুবিয়ে রেখে জাঁক দিয়ে পাতাকে সোজা করা হয়। তারপর সেই পাতাকে সাইজ করে কাটা, সরু লম্বা কাঠি দিয়ে বাঁধা, রং করা ইত্যাদি নানা পর্বের মধ্য দিয়ে পাখা তৈরি হয়। অনেকে আবার পাখার বেড়ে রঙিন শালু কাপড় কেটে জুড়ে দেয়, পাখা ও তার দন্ডে রঙ দিয়ে নকশা তৈরি করে। চারকোনা, তিনকোনা, গোলপাখা, চাকতি পাখা এরকম অনেক রকম তৈরি করা হয়।পদ্ম, শতফুল, ঊনিশকাঁটা, সংকলন, বরফি, শিঙারা, শঙ্খ, আয়নাকোটা, শঙ্খপদ্ম, ঝুরিফুল, চালতা ফুল, পানপাতা, তারাফুল, চারমাছ, হাতিবান্ধা, মোরগ, চৌখুপি, চক্র—এসব হলো পাখার নকশার নাম।
পূর্ব মেদিনীপুরের কোলাঘাট এলাকার গ্রাম বা তমলুক থানার পাকুড়িয়া পাখাগ্রাম নামে পরচিত। এ রকম পাখাগ্রাম আরও আছে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন এলাকায়।
গ্ৰাম বা মফঃস্বলে হাত পাখার প্রয়োজন পড়ে এখনও।তবে সেখানেও তালপাতার বদলে প্লাস্টিকের হাত পাখার দাপটে হারিয়ে যেতে বসেছে তাল পাতার পাখা।
প্রতিদিনই কমছে গাছপালার সংখ্যা তাই তাল গাছ ও কমছে। যদিও বা দূরদূরান্ত থেকে তালপাতা সংগ্রহ করা যাচ্ছে সেখানে আবার পাখা তৈরি করার কারিগর মেলা ভার। নানান সমস্যায় জর্জরিত তালপাতার পাখার তাই এখন অস্তিত্বের সংকট।
এক সময়ে গরম পড়লেই যেখানে তালপাতার পাখার চাহিদা তুঙ্গে উঠত, সেই চাহিদা কমছে দিন দিন। পুজো বা সামাজিক অনুষ্ঠান ব্যতীত একদিন হয়ত , উচ্চবিত্ত বা মধ্যবিত্তের ড্রইং রুমে ক্রিস্টালের দামী শো-পিসের সাথে ই জায়গা করে নেবে তালপাতার হাতপাখা।



No comments:
Post a Comment