Friday, May 10, 2019

১৯২৭ সাল থেকে আজও আপাদমস্তক বাঙালিয়ানায় মোড়া শহরের এই হিন্দু হোটেল


দেবযানী সরকার: কোনো কেতাবি নাম কিংবা বিজ্ঞাপনের জাঁক নেই৷ লোকদেখানো বাঙালিপনাও নেই৷ রাস্তার ধারে ছাপোষা এক ভাতের হোটেল এখনও ধরে রেখেছে আভিজাত্য, বনেদিয়ানা৷ দেশের ইতিহাসের গলিঘুঁজিতে জায়গা করে নিয়েছে স্বমহিমায়৷

‘স্বাধীন ভারত হিন্দু হোটেল’ নামেই এর পরিচয়৷ এটি রয়েছে প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয় লাগোয়া ভবানী দত্ত লেনে৷

প্রথমে অবশ্য ‘হিন্দু হোটেল’ নামেই পথ চলা শুরু৷ ১৯২৭ সালে ওডিশা থেকে আসা মানগোবিন্দ পণ্ডা এই হোটেল চালু করেন৷ কে খাননি এখানে? ছাত্রনেতা হিসাবে সুভাষচন্দ্র বসু তো ছিলেন এর অন্যতম খদ্দের৷ বহুবার এসে খেয়ে গিয়েছেন৷

এই হোটেলে মধ্যাহ্নভোজন করেছেন ঋষি অরবিন্দ সহ অনেক স্বাধীনতা সংগ্রামী৷ শুধু খাওয়া নয়, বিপ্লবের সময় হোটেলের ভিতর গা ঢাকাও দিয়েছেন তাঁরা৷ সেইকারণেই দেশাত্মবোধের ঐতিহ্য বজায় রেখেছিলেন মানগোবিন্দ ও তাঁর ভাই প্রহ্লাদ পন্ডা৷ দেশ স্বাধীনের পর ২৫ জানুয়ারি হোটেলের নাম বদলে দেওয়া হয়৷ নতুন নাম হয় ‘স্বাধীন ভারত হিন্দু হোটেল’৷ ভবানী দত্ত লেনের এই হোটেল এখনও মুড়ে আছে আপাদমস্তক বাঙালিয়ানায়৷

ইতিহাস বিজড়িত এই হোটেলে এখনও থালার উপর কলাপাতা দিয়ে ভাত দেওয়া হয়৷ সঙ্গে মাটির ভাঁড়ে জল৷ রান্নার মেনু ও স্বাদ হার মানাতে পারে যে কোনও বাঙালি খাবারের চেন রেস্তোরাঁকে৷ বাঙালির খাদ্যাভাসের দূর্বল জায়গাটা জানতেন উড়িষ্যা থেকে আসা মানগোবিন্দ পণ্ডা ও তাঁর পরিবার৷ তাই মাছ-ভাতের আইটেমে জোর দিয়েছিলেন৷ তাতেই মজে গিয়েছিলেন অরবিন্দ থেকে নেতাজি সহ বিপ্লবীরা৷

এখনও প্রতিদিন ১২-১৩ রকমের মাছের পদ হয়৷ মেনুতে থাকে রুই মাছের কালিয়া, চিতল মাছের কোর্মা, পাবদার ঝাল, চিংড়ির মালাইকারি সহ আরও অনেক কিছু৷ গলির এই ভাতের হোটেলে মাছের মাথা দিয়ে মুগের ডাল, পুঁই বিটুঁলির চচ্চড়ি, আলুভাজা, সেঁকা পাপড় আর আমের চাটনি খেলে তৃপ্তি ফ্রি৷ প্রয়াত মানগোবিন্দের তৃতীয় প্রজন্ম অরুনাংশু পন্ডা বলেন, বাঙালিরা প্রতিদিন এক রান্না খেতে ভালোবাসেন না৷ তাই রোজই মেনুতে বদল হয়৷ এখানে সব রান্না বাটা মশলায় হয়৷ যেহেতু কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের এলাকা তাই ছাত্র-ছাত্রীদের কথা ভেবে আমরা দাম সাধ্যের মধ্যে রেখেছি৷ তবে সব ধরনের মানুষ এখানে খেতে আসেন৷

দাদু-বাবার কাছে থেকে হোটেলে নেতাজি-অরবিন্দের খাওয়ার গল্প শুনেছেন সিনেম্যাটোগ্রাফির ছাত্র অরুনাংশু৷ তাঁর কথায়, প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়ার সময়ে আমাদের এখানে নেতাজি খেয়েছেন! এসব যখন ভাবি তখন গায়ে কাঁটা দেয়৷ আমি চাই শহরের অনান্য জায়গাতে স্বাধীন ভারত হিন্দু হোটেলের শাখা খুলতে৷ অনেক চেষ্টাও করেছি৷ কিন্তু জমির সমস্যায় হয়ে ওঠেনি৷

বাঙালি খাবারের চেন রেস্তোরাঁর মতো ঝাঁ-চকচকে না হলেও টিউব লাইটের আলোয় শহরের এই প্রাচীন হোটেল আজও ঐতিহাসিক গর্বে উজ্বল৷


No comments:

Post a Comment

হাওড়া শ্যামপুরে বাছরী যুব সংঘে মা সাজবেন রেশমী সুতোর সাজে

অর্পণ দাস:  হাওড়া গ্রামীণ অঞ্চলের শ্যামপুর থানার বাছরী গ্রামের "বাছরী যুব সংঘের" সার্বজনীন দুর্গোৎসবের এবছর ৫৩ তম বর্ষ । বিগত...