Tuesday, July 9, 2019

কেশব চন্দ্র নাগ থেকে কে সি নাগ হয়ে ওঠা এক বিস্মৃতপ্রায় অঙ্কের মাস্টারমশাইয়ের অজানা কথা


রণতোষ মুখোপাধ্যায়--অঙ্ক আপনি ভালবাসুন বা না বাসুন, ছাত্রজীবন থেকে শেষজীবন অবধি সে আপনার পিছু ছাড়বে না। ছাত্রজীবনে অনেক দুরূহ অঙ্ক মিললেও জীবনযুদ্ধে এমন অনেক অঙ্ক না মেলাতে পারায় অনেকে হারিয়ে যায় অচিরেই।

 একটি অনুষ্ঠানের আমন্ত্রনে গিয়েছিলাম হুগলীর গুড়াপে। কথায় কথায় জানলাম আমি যেখানে আছি তার ঠিক পাশেই সেই মানুষটির বাড়ি যাকে আমার মতো অঙ্কে কাঁচা অনেকেই শত্রু ভাবতাম ছাত্র জীবনে। কে.সি.নাগ নামটাই তখন আমাদের কাছে মূর্তিমান নাগের থেকেও ভয়ঙ্কর। যারা সহজেই তাঁর বইয়ের অঙ্ক সমাধান করে দিত তাদের ওপর ভীষণ হিংসে হত। তাই লোভ সামলাতে পারলাম না ছাত্রজীবনের সেই ত্রাসের ভিটেতে যাবা্র, তাঁর সম্বন্ধে কিছু জানার। রঘুনাথ নাগ ও ক্ষীরোদা সুন্দরীর একমাত্র সন্তান কেশবচন্দ্র নাগই পরিচিত কে.সি.নাগ নামে। মাত্র তিন বছর বয়সে বাবাকে হারিয়ে জীবনযুদ্ধে লড়াইয়ের অঙ্কটা সেদিনই কষে ফেলেন কেশব। গ্রামের পথ শেষে রিপন কলেজে ভর্তি হন। সেখানে আই.এস.সি. পরীক্ষায় ফাস্ট ক্লাস পেয়েও আর্থিক অনটনের কারনে পড়াশোনা ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। পরবর্তীকালে তিনি অঙ্ক ও সংস্কৃততে বি.এ. পাশ করেন। কিষানগঞ্জ হাইস্কুল, বহরমপুরের কৃষ্ণনাথ কলেজিয়েট স্কুল থেকে একের পর এক আসে চাকরির সুযোগ।
অনেকেই জানেন না   রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের অধ্যক্ষ স্বামী বিশুদ্ধানন্দের  নির্দেশে    ১৯১৯সালে মা সারদাদেবীর কাছ থেকে  দীক্ষা লাভ করেন  কেশবচন্দ্র।সেইসময় কাশীবাজারের মহারাজ মনীন্দ্রনাথ নন্দীর নিজস্ব বৃহৎ এক লাইব্রেরীতে তিনি ভা্রতের ইতিহাস ও হিস্ট্রি অফ ম্যাথম্যাটিকস সম্বন্ধীয় সমস্ত বইগুলি পড়ে ফেলেন। স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় তখন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর। মিত্র ইনস্টিটিউশন তখন কলকাতার অন্যতম নাম করা স্কুল। ভবানিপুরে এই স্কুলের শাখা তৈরী করে স্যার আশুতোষ খুঁজছিলেন শহরের সেরা শিক্ষকদের। তিনি শুনেছিলেন কেশবচন্দ্রের পান্ডিত্যের কথা, তাই সময় ব্যায় না করে তিনি তাঁকে নিয়ে আসেন সেই স্কুলের অঙ্কের শিক্ষক করে। পরবর্তীকালে দুজনের সম্পর্ক বেশ দৃঢ় হয়। আশুতোষ পুত্র শ্যামাপ্রসাদ  তাঁকে রাজনীতিতে আসার ডাক দিলেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন প্রতিবার।

অঙ্কের শিক্ষক হিসাবে তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে একসময়। তাঁর ছাত্রদের তালিকায় আছেন সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়‚ সুভাষ মুখোপাধ্যায়‚ হেমন্ত মুখোপাধ্যায়‚ বিকাশ রায়‚ রঞ্জিত মল্লিকের মতো দিকপালরা ৷
রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের মহারাজ বিষ্যুদানন্দ মহারাজের অত্যন্ত স্নেহের ছিলেন কেশবচন্দ্র। ভাবতে অবাক লাগে, কঠিন কঠিন অঙ্ক বইয়ের প্রনেতা এই মানুষটিই আবার ‘রত্নবেদী’ নামে একটি বই লিখেছিলেন। যাতে আছে অজস্র কবিতা, গান ও জোকস। তিনি একাধারে যেমন গান্ধীজির ভারত ছাড়ো আন্দোলনে যোগ দিয়ে জেল খেটেছিলেন তেমনই খেলাধুলোয়ও তিনি ছিলেন সমান আগ্রহী। তিনি ছিলেন মোহনবাগান ক্লাবের আজীবন সদস্য। খেলাপ্রিয় এই মানুষটি তাই খেলাচ্ছলেই ছাত্রদের অঙ্ক শিখিয়েছিলেন। গুড়াপে লোকচক্ষুর আড়ালেই পালিত হয় তাঁর জন্মবার্ষিকী ।ঠিক যেমন আজ হচ্ছে।
আজ আপনি নেই তাই আপনার বাড়িটাই আজ অঙ্কের প্রতিষ্ঠান। আর আপনার এই বাড়িটা ছুঁয়েই আপনাকে প্রনাম জানালাম স্যার।







No comments:

Post a Comment

হাওড়া শ্যামপুরে বাছরী যুব সংঘে মা সাজবেন রেশমী সুতোর সাজে

অর্পণ দাস:  হাওড়া গ্রামীণ অঞ্চলের শ্যামপুর থানার বাছরী গ্রামের "বাছরী যুব সংঘের" সার্বজনীন দুর্গোৎসবের এবছর ৫৩ তম বর্ষ । বিগত...