Wednesday, June 19, 2019

বিহারে মহামারির আকার নিচ্ছে‌ এনসেফেলাইটিস, শিশু মৃত্যু মিছিল অব্যাহত


                   

News H Times ডিজিটাল ডেস্ক:-  এনসেফেলাইটিস, লিচুর বিষ, অপুষ্টি নাকি তাপপ্রবাহ, বিহারে শিশুমৃত্যুর কারণ নিয়ে এখনও ধন্দে নীতিশ কুমারের স্বাস্থ্য দফতর , বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের নানান মুনির নানা মত।
প্রাথমিকস্তরে  রাজ্য স্বাস্থ্য দফতরের দাবি ছিল হাইপোগ্লাইসিমাতে শিশুদের মৃত্যু হয়েছে। হাইপোগ্লাইসিমায় রক্তে শর্করার পরিমাণ কমে যায়।

বিশেষজ্ঞদের কেউ বলছেন, শিশুমৃত্যুর কারণ অপুষ্টি। কেউ বলছেন, লিচুর বিষ থেকেই এই ঘটনা ঘটছে। আবার কেউ বলছেন, তীব্র তাপপ্রবাহের জন্যই একের পর এক শিশুর মৃত্যু হচ্ছে বিহারে। তবে একটা ব্যাপারে সকলেই একমত, শিশুরা যে রোগ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে, তার নাম- 'অ্যাকিউট এনসেফেলাইটিস সিনড্রোম (এ ইএস)'। এখনও পর্যন্ত এই রোগে আক্রান্ত হয়ে মুজফ্ফরপুরের শ্রীকৃষ্ণ মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৩০৬টি শিশু।

বিশেষজ্ঞদের মতে, (এই এ স ) হতে পারে ভাইরাস বা ব্যাকটিরিয়ার হানাদারিতে। ছত্রাক বা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র পরজীবী প্রাণীদের হঠাৎ আক্রমণে। অথবা কোনও রাসায়নিক বা বিষ শরীরে ঢোকার ফলে। তবে এইএস মানেই এনসেফেলাইটিস, তা মানতে রাজি নন ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন অব পেডিয়াট্রিক্স (আইএপি)-এর প্রাক্তন সভাপতি ও ভেলোরের ক্রিশ্চান মেডিক্যাল কলেজের ভাইরোলজি বিভাগের এমেরিটাস প্রফেসর টি জে জন। তিনি জানাচ্ছেন, শিশুদের মস্তিষ্কের যে কোনও রোগকেই বলা হয় এইএস বা অ্যাকিউট এনসেফেলাইটিস সিনড্রোম। শিশুদের খিঁচুনি হলে বা তারা হঠাৎ অচৈতন্য হয়ে পড়লেও, অপ্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীরা তাকে এইএস বলেন। কিন্তু সেটা এইএসের কোন রোগ, সেটা একমাত্র বুঝতে পারেন চিকিৎসকরাই, পরীক্ষানিরীক্ষার পর। তা এনসেফেলাইটিস হতে পারে। যা ভাইরাসের হানাদারির জন্য হয়। তার ফলে প্রদাহ (লক্ষণ, ফোলা, দাগ) হয় শিশুদের মস্তিষ্কে। হতে পারে মেনিনজাইটিস। মস্তিষ্ক (ব্রেন) ও মেরুদণ্ড (স্পাইনাল কর্ড)-এর বাইরে যে নিরাপত্তার আবরণী থাকে, তা ক্ষয়ে যেতে থাকে দ্রুত। এইএসের ফলে আরও দু'টি রোগ হতে পারে শিশুদের। এনসেফ্যালোপ্যাথি ও সেরিব্রাল ম্যালেরিয়া। এনসেফ্যালোপ্যাথি হল সেই রোগ যার ফলে মস্তিষ্কের গঠন বা কাজকর্ম বদলে যায়। আর সেরিব্রাল ম্যালেরিয়া হল সেই রোগ যার ফলে ম্যালেরিয়ার সঙ্গে সংক্রমণ ঘটিত স্নায়ুতন্ত্রে নানা রকমের জটিলতা দেখা যায়।


কেন এনসেফেলাইটিসে একের পর এক শিশুমৃত্যুর ঘটনা ঘটছে বিহারে? ইতিমধ্যেই ১২৬টি শিশুর মৃত্যু হয়েছে মুজফ্ফরপুরে। এর কারণ কি সরকারি গাফিলতি? হাসপাতালে চিকিৎসা ব্যবস্থার অভাব? নাকি রোগনির্ণয় বা রোগের কারণ নির্ধারণে কোনও ভুল থেকে যাচ্ছে?

এনসিডিসি এবং সিডিসি গবেষণা চালিয়েছিল ২০১১ থেকে ২০১৩ পর্যন্ত। সেই গবেষণা থেকে তারা জানাচ্ছে, লিচুর বিষ থেকেই এই রোগের উৎপত্তি। ওই গবেষকদলের অন্যতম সদস্য চিকিৎসক বিপিন বশিষ্ঠ বলেছেন, "লিচুর বিষ বা আরও অন্য কারণ থাকতে পারে। তবে এই রোগের সঙ্গে লিচু চাষের সম্পর্ক রয়েছে।"

বিশিষ্ট ভাইরাস বিশেষজ্ঞ টি জি জনের মতে, বিহারে শিশুদের অপুষ্টির মাত্রা ভয়াবহ। রাজ্যের ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ শিশু ভোগে অপুষ্টির সমস্যায়। তারা শুধু গাছ থেকে পেড়ে লিচু খায়। আর কোনও খাবার না খেয়েই ঘুমিয়ে পড়ে। লিচুর মধ্যে থাকে একটি বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ। যার নাম- 'মিথিলিন সাইক্লোপ্রোপিল-গ্লাইসিন (এমসিপিজি)'। এই রাসায়নিকই অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের মস্তিষ্কে নানা রকমের জটিলতার সৃষ্টি করে।

তবে এ বার সেই ধারণাটা বদলে গিয়েছে বলে দাবি করেছেন মুজফ্ফরপুরের শ্রীকৃষ্ণ মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের শিশুরোগ বিভাগের প্রধান চিকিৎসক গোপাল শঙ্কর। তাঁর কথায়, "তীব্র তাপপ্রবাহ ও কম বৃষ্টিপাতের মতো পরিবেশগত কারণেই এই শিশুমৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। ২০০৫, ২০১১, ২০১৩, ২০১৪ এবং ২০১৯, যে ক'বার বিহারে এমন রোগে শিশুমৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে, দেখা গিয়েছে, প্রতি বারই তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি ছিল ।


গোপাল শঙ্কর মানতে চাননি, লিচুর বিষ থেকেই এই রোগের উৎপত্তি। তাঁর বক্তব্য, "এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার পর কোনও শিশুকে আমি তলপেটের কোনও সমস্যায় ভুগতে দেখিনি। লিচুর বিষই যদি এই রোগের কারণ হত, তা হলে কিন্তু শিশুদের ভুগতে হত তলপেটের সমস্যায়।"




বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমার মঙ্গলবার মুজফ্ফরপুরের হাসপাতালে  অসুস্থ শিশুদের দেখতে যান। যদিও,  রোগের প্রাদুর্ভাবের দু সপ্তাহ পর মঙ্গলবার মুজফফরপুরে হাসপাতাল পরিদর্শনে গিয়ে বিক্ষোভের মুখে পড়েন নীতীশ । গত রবিবার মুজফ্ফরপুরে ওই হাসপাতালে এসেছিলেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হর্ষ বর্ধন। তাঁর বক্তব্য, "রোগের আদত কারণ আগে খুঁজে বের করতে হবে।"

এদিকে, এতগুলো মৃত্যুর জন্য দায়ী করে জনস্বার্থ মামলা দায়ের  হয়েছে বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমারের বিরুদ্ধে। পিপিআই এল-এ  রয়েছে কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী হর্ষ বর্ধনের নামও।
 মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে এখনও স্পষ্টভাবে কোনও ধারণা দিতে পারেনি তাঁর স্বাস্থ্য দফতর। এই রোগ মূলত ১-১০ বছরের শিশুদেরই হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি শিশুর মৃত্যু হয়েছে শ্রীকৃষ্ণ মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে।
এদিকে, এনসেফালাইটিসে মৃত্যুর ঘটনায় নীতীশ ও হর্ষ বর্ধনের পাশাপাশি বিহারের স্বাস্থ্যমন্ত্রী মঙ্গল পাণ্ডে, স্বাস্থ্য দফতরের প্রতিমন্ত্রী অশ্বিনী চৌবের বিরুদ্ধে জনস্বার্থ মামলা দায়ের করা হয়েছে। ২৬ জুন সেই মামলা আদালতে উঠবে। এই ঘটনায় সরকারি ব্যর্থতার অভিযোগে সোচ্চার হয়েছে কংগ্রেস।
 রাজ্যের বিরোধীদল আরজেডি নেতা রামচন্দ্র পূর্বের অভিযোগ, বিহার সরকার ওই রোগের মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে তারা বিধানসভায় সোচ্চার হবেন বলেও তিনি মন্তব্য করেন।



No comments:

Post a Comment

হাওড়া শ্যামপুরে বাছরী যুব সংঘে মা সাজবেন রেশমী সুতোর সাজে

অর্পণ দাস:  হাওড়া গ্রামীণ অঞ্চলের শ্যামপুর থানার বাছরী গ্রামের "বাছরী যুব সংঘের" সার্বজনীন দুর্গোৎসবের এবছর ৫৩ তম বর্ষ । বিগত...